আজকের সমাজেও চাকরির তুলনায় ব্যবসা ছোট কেন ?

শ্যামল রং, মনসুকা খবর: আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ধারণার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে এক স্ববিরোধী বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এটি এমন একটি চিত্র যেখানে উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিধারী একজন ব্যক্তি যদি কর্মহীন থাকেন, তবে তাকে 'মূর্খ' বা ব্যর্থ হিসেবে দেখা হয়। অথচ একই সমাজে, যিনি মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি, তিনি যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি চাকরি পান, তবে তাকে 'শিক্ষিত' এবং প্রতিষ্ঠিত বলে গণ্য করা হয়। এই বৈপরীত্য আরও গভীর হয় যখন একজন সফল ব্যবসায়ী, যিনি মাসে লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করেন, তাকে 'বেকার' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু ২০ হাজার টাকা বেতনের একজন চাকরিজীবী বিবেচিত হন 'সফল' হিসেবে। এই প্রতিবেদনটি এই গভীর সামাজিক প্যারাডক্সের মূল কারণগুলো উন্মোচনের উদ্দেশ্যে প্রণীত। এটি কেবল অর্থনৈতিক সাফল্যের মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করে না, বরং এর গভীরে প্রোথিত ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলোর একটি বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ প্রদান করে।

এই প্রতিবেদনটির লক্ষ্য হলো উপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির যুগ পর্যন্ত সামাজিক মূল্যবোধের বিবর্তনকে চিহ্নিত করা, যা এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে। প্রদত্ত গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে, কেন সমাজে 'চাকরি' নিরাপত্তা, সম্মান এবং শিক্ষাকে সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তার একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে তুলে ধরা হবে। একই সাথে, কেন ব্যবসাকে এখনও অনিশ্চিত এবং কম নির্ভরযোগ্য পেশা হিসেবে দেখা হয়, তার পেছনের মানসিক ও সাংস্কৃতিক কারণগুলোও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। পরিশেষে, শিক্ষিত বেকারত্ব, নিয়োগ দুর্নীতি এবং উদীয়মান স্টার্টআপ সংস্কৃতির মতো সমসাময়িক বিষয়গুলো কীভাবে এই পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তার একটি পর্যালোচনা থাকবে।

পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক মৌলিক পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তন এক নতুন সামাজিক শ্রেণির জন্ম দেয়, যারা প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। রবার্ট ক্লাইভ দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়) ক্ষমতা লাভ করার পর একটি প্রাথমিক সিভিল সার্ভিস চালু করেন, যার প্রধান কাজ ছিল দেশীয় রাজস্ব সংগ্রাহকদের তদারকি করা। এর মাধ্যমে বাঙালিরা প্রথমবার সরকারি ক্ষমতা ও প্রশাসনের কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়, যা সামাজিক ক্ষমতার এক নতুন উৎস তৈরি করে । এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুইটি স্বতন্ত্র অথচ সম্পর্কিত সামাজিক শ্রেণির বিকাশ ঘটে, যারা এই অঞ্চলের সামাজিক মূল্যবোধের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

প্রথমদিকের 'বাবু'রা ছিলেন মূলত ধনী ব্যবসায়ী বা 'বেনিয়ান' (banian), যারা ব্রিটিশদের সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছিলেন । এই শ্রেণির উত্থান ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাণিজ্য প্রসারে সহায়তা করার স্বীকৃতিস্বরূপ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তারা এবং এমনকি রানি ভিক্টোরিয়া নিজেও এই ধনী ভারতীয়দের 'বাবু' উপাধিতে ভূষিত করতেন । রাজা নবকৃষ্ণ দেবের মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি লর্ড ক্লাইভের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, এই শ্রেণির প্রথম দিকের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিলেন । এই বাবুরা কলকাতার অভিজাত শ্রেণির অংশ ছিলেন এবং তাদের জীবনযাত্রা ছিল বিলাসবহুল, যা ব্রিটিশ ও দেশীয় সংস্কৃতির এক মিশ্র রূপ ধারণ করেছিল । এই সময়কালে সামাজিক ক্ষমতা ছিল মূলত বিত্ত এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসা তখন ক্ষমতার একটি স্বীকৃত উৎস ছিল।

লর্ড কর্নওয়ালিস যখন ১৭৯৩ সালে 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' চালু করেন, তখন জমিদারি প্রথা স্থায়ী রূপ নেয়। এর ফলে পুরোনো বিত্তবান বণিক শ্রেণির উদ্বৃত্ত পুঁজি ভূসম্পত্তিতে বিনিয়োগ হতে শুরু করে । একই সময়ে, কর্নওয়ালিস ভারতীয়দের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ব্রিটিশদের জন্য 'Covenanted Civil Service' (সিসিএস) চালু করেন । এই পরিবর্তনের ফলে বিত্ত এবং ক্ষমতার উৎস হিসেবে ব্যবসার গুরুত্ব কমতে শুরু করে। তবে, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে কেরানি, শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী ইত্যাদি পদে চাকরির সুযোগ তৈরি হয় । দীনবন্ধু মিত্রের মতো ব্যক্তিদের জীবনকাহিনীতে দেখা যায় কীভাবে উচ্চবিত্ত পরিবার থেকেও একজন ব্যক্তি সরকারি চাকরির খোঁজে গৃহত্যাগ করে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন । 

এই দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিল সামাজিক মর্যাদার এক মৌলিক পরিবর্তনের কাল। বিত্তশালী 'বাবু'র ক্ষমতা ধীরে ধীরে আমলাতান্ত্রিক 'ভদ্রলোক'-এর কাছে স্থানান্তরিত হয়। এই নতুন শ্রেণিটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে কাজ করে একটি স্থিতিশীল ও সম্মানজনক জীবন বেছে নেয় । এই মানসিকতার মূল কারণ ছিল উপনিবেশিক শাসনের অধীনে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকি। মুসলমান অভিজাত শ্রেণি এই 'ভদ্রলোক' সংস্কৃতি থেকে নিজেদের আলাদা রাখতেন, যা এর হিন্দু-প্রভাবিত চরিত্রকে নির্দেশ করে । এই ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, একটি ধারণা সমাজে বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, সত্যিকারের সম্মান, ক্ষমতা এবং নিরাপত্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগ (ব্যবসা) থেকে আসে না, বরং তা আসে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে। ব্যবসা তখন ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হতে শুরু করে, কারণ তা সরাসরি ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছিল । এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই আধুনিক সমাজে চাকরির প্রতি অস্বাভাবিক ঝোঁকের মূল কারণ। 

চাকরি, বিশেষত সরকারি চাকরি, কেবল একটি পেশা নয়; এটি আমাদের সমাজে নিশ্চিত কর্মসংস্থান, চাকরির স্থায়িত্ব এবং কম ঝুঁকির এক প্রতীক । এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট দিন শেষে একটি নির্ধারিত বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা পায় । পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সুবিধাগুলো অবসর জীবনকে নিরাপদ করে তোলে, যা জীবনের একটি বড় অংশের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে । আমাদের সমাজে আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গভীর। এটি উপনিবেশিক শোষণ, দুর্ভিক্ষ (যেমন ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, যা দ্বৈত শাসনের ফলস্বরূপ ঘটেছিল ), এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদী অভিজ্ঞতার ফলাফল। এই অভিজ্ঞতাই চাকরির মতো একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎসকে চরম আকাঙ্ক্ষার বস্তুতে পরিণত করেছে। চাকরি শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি 'লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম'—যা একটি পরিবারকে আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বৃদ্ধ বয়সে নিরাপত্তা প্রদান করে। 

এই মানসিকতার কারণে, একজন উচ্চ আয়ের ব্যবসায়ীকে 'বেকার' বলার কারণ তার আর্থিক আয় নয়, বরং তার পেশার অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা। সমাজে তাকে এমন একটি পথের পথিক হিসেবে দেখা হয়, যার কোনো 'নিশ্চয়তা' নেই । এই মানসিকতার কাছে ব্যবসা করে মাসে ১ লক্ষ টাকা আয় করাকে 'অনিরাপদ' বলে মনে হয়, কারণ এই আয় কালকেই শূন্য হয়ে যেতে পারে। পক্ষান্তরে, কুড়ি হাজার টাকার সরকারি চাকরিটি 'সাকসেসফুল', কারণ এটি আজীবন চলবে বলে ধারণা করা হয় । এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, সমাজে আর্থিক সাফল্যের চেয়ে মানসিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার মূল্য অনেক বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাকরির প্রভাব আরও গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারি কর্মসংস্থান প্রকল্প যেমন মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প (MGNREGA) এবং কর্মশ্রী গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি স্থির আয় প্রদান করে, যা দারিদ্র্য হ্রাস, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ এবং গ্রামীণ-শহুরে অভিবাসন কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে । 

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়, যেমন ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত ব্যক্তিরা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজস্ব আদায়ের মতো প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করেন । এই প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তাকে আর্থিক আয়ের বাইরেও এক ধরনের 'সামাজিক পুঁজি' বা 'কর্তৃত্ব' এনে দেয়। তিনি গ্রামের মানুষের কাছে 'কর্তা' হিসেবে পরিচিত হন, কারণ তিনি সরকারি পরিষেবা, কাগজপত্র বা অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে সাহায্য করতে পারেন। এই সামাজিক পুঁজি একজন ব্যবসায়ীর অর্জিত আর্থিক সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান বিবেচিত হয়। এটিই ব্যাখ্যা করে কেন ২০ হাজার টাকার চাকরিজীবী সাকসেসফুল আর ১ লক্ষ টাকা আয়কারী ব্যবসায়ী 'বেকার'। তার সাফল্যের সংজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও ক্ষমতার দিক থেকেও সংজ্ঞায়িত। 

আমাদের সমাজে শিক্ষা একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি ভালো চাকরি পাওয়ার 'একমাত্র উপায়' হিসেবে বিবেচিত হয় । সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হয় তার ভালো রেজাল্ট বা চাকরির প্রাপ্তি দিয়ে । এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে যা তত্ত্বীয় জ্ঞান এবং মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল, ব্যবহারিক বা পেশাগত দক্ষতার ওপর নয় ।

শিক্ষাব্যবস্থা এবং চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা রয়েছে । দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, যার ফলে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি । অনেক শিক্ষিত যুবক উৎপাদনশীল বা কৃষিখাতের কাজে যুক্ত হতে চান না, যা তাদের পেশাগত সুযোগকে আরও সীমিত করে দেয় । 

এই প্রেক্ষাপটে, একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিকে 'মূর্খ' বলার কারণ তার জ্ঞানের অভাব নয়, বরং তার ডিগ্রিটিকে সামাজিক মূল্যে (চাকরি) রূপান্তরিত করতে না পারার অক্ষমতা। সমাজ মনে করে, তার মেধা থাকা সত্ত্বেও সে 'সফলতার কোড' (চাকরি) ভাঙতে পারেনি, তাই সে ব্যর্থ। অন্যদিকে, মাধ্যমিক ফেল করা ব্যক্তিটিও চাকরি পেলে 'শিক্ষিত' উপাধি পায়, কারণ সে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে—সে শিক্ষার ব্যবহারিক ফল (চাকরি) দেখাতে পেরেছে। এখানে 'শিক্ষিত' মানে ডিগ্রিধারী নয়, বরং 'সফল' বা 'প্রতিষ্ঠিত'। এই প্যারাডক্সটি আমাদের সমাজের শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকে কীভাবে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তার প্রমাণ।

ঐতিহাসিকভাবে, বাঙালি সংস্কৃতিতে, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা দীর্ঘকাল ধরে একটি কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধ মূলত ঔপনিবেশিক আমলের অনিশ্চয়তা এবং ভূসম্পত্তির স্থিতিশীলতার অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত। এই মানসিকতা থেকে দেখা যায়, ব্যবসার নিজস্ব অনিশ্চয়তা (ঝুঁকি) এবং নিয়মিত ছুটির অভাব  সামাজিক নিরাপত্তার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। ব্যবসাকে সাধারণত একটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিশ্চিত পেশা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে লোকসানের সম্ভাবনা থাকে । সামাজিকভাবে ব্যবসার চেয়ে চাকরির প্রতিই বেশি উৎসাহ দেওয়া হয়, বিশেষত পারিবারিক স্তরে। পারিবারিক পরামর্শে প্রায়শই বলা হয়, 'ব্যবসা করার আগে একটা ভালো চাকরি করে নিজের টাকা জমাও' । ব্যবসায়ীরা কেবল ঝুঁকিই গ্রহণ করেন না, তাদের কোনো নির্দিষ্ট সাপ্তাহিক ছুটিও থাকে না; তাদের ২৪/৭ কাজ করতে হতে পারে । 

তবে, আধুনিক বিশ্বে উদ্যোক্তাদের ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা কেবল মুনাফা অর্জনকারী নন, বরং তাঁরা সমাজের পরিবর্তনকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন । তাঁরা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেন, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা নিয়ে আসেন এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে অবদান রাখেন । 

প্রচলিত সামাজিক ধারণার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঘটনা গভীর প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নিয়োগ দুর্নীতি এবং নতুন প্রজন্মের পরিবর্তিত আকাঙ্ক্ষা। সাম্প্রতিক নিয়োগ দুর্নীতি, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এসএসসি কেলেঙ্কারি, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে । এই দুর্নীতি প্রমাণ করে যে, মেধা এবং যোগ্যতার চেয়ে ঘুষ ও 'মামা-চাচা'র জোর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ । আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি ছিল: 'শিক্ষিত হও, তবেই চাকরি পাবে'। এটি লক্ষ লক্ষ পরিবারের জন্য একটি মূল চালিকাশক্তি ছিল। এসএসসি কেলেঙ্কারির মতো ঘটনাগুলো এই সামাজিক চুক্তিকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। এর ফলে শুধু চাকরি হারানো বা বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়নি, বরং সমাজের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ মেধার প্রতি আস্থাই ভেঙে গেছে । এই আস্থার সংকটের ফলে শিক্ষিত বেকাররা চাকরির ওপর থেকে তাদের নির্ভরতা কমাতে শুরু করতে পারে। এটি পরোক্ষভাবে চাকরির বাইরে থাকা পেশা, বিশেষ করে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করতে পারে। 

ভারত সরকারের 'স্টার্টআপ ইন্ডিয়া'র মতো উদ্যোগগুলো তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করছে । এই উদ্যোগে কর ছাড়, সহজ ঋণ এবং মেন্টরশিপের মতো সুবিধা দেওয়া হয়, যা ঝুঁকির মানসিকতাকে কিছুটা হ্রাস করে । আধুনিক প্রজন্ম (Gen Z) তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের (Baby Boomers, Gen X) তুলনায় কর্মজীবন সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে । তারা কেবল আর্থিক নিরাপত্তা নয়, বরং কাজের স্বকীয়তা, সৃজনশীলতা এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যের ওপর জোর দেয় । পশ্চিমা কর্মসংস্কৃতির (individualism, open communication) প্রভাব এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এই নতুন মানসিকতার জন্ম দিয়েছে । এই তরুণরা এমন চাকরিকে 'অসৃজনশীল' বা 'সীমিত' বলে মনে করে , যা তাদের মেধা ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটায় না। তাই তারা স্বেচ্ছায় ব্যবসার ঝুঁকি নিতে আগ্রহী, যা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম কল্পনাই করতে পারত না। এই প্রজন্মই ভবিষ্যতে চাকরির বাইরে সাফল্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে এবং প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। 

আমাদের সমাজে চাকরি, শিক্ষা এবং সাফল্য সম্পর্কে যে প্রচলিত ধারণাগুলো বিদ্যমান, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের ফল। উপনিবেশিক আমলে 'ভদ্রলোক' সংস্কৃতির উত্থান, যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় স্থিতিশীল জীবনকে সম্মানজনক বলে মনে করত, তা এই মানসিকতার মূল ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর থেকে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত 'নিরাপত্তা'র মানসিকতা চাকরির প্রতি আমাদের অত্যধিক নির্ভরতাকে আরও বাড়িয়েছে। শিক্ষাকে শুধু চাকরির একটি সনদ হিসেবে দেখা, এবং সফল ব্যবসাকে 'বেকার' হিসেবে চিহ্নিত করা—এই সবকিছুই এই মূল দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

যাইহোক, আধুনিক যুগের কিছু ঘটনা, যেমন নিয়োগ দুর্নীতি, প্রচলিত সামাজিক চুক্তির ওপর থেকে আস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। একই সময়ে, 'স্টার্টআপ ইন্ডিয়া'-এর মতো সরকারি উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মের ভিন্ন মূল্যবোধ প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এই প্রজন্ম কেবল আর্থিক নিরাপত্তা নয়, বরং সৃজনশীলতা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক প্রভাবের ওপর জোর দিচ্ছে। ভবিষ্যতের পথ হলো এই দৃষ্টিভঙ্গির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান নয়, বরং প্রায়োগিক দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা তৈরি করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে । সরকারকে উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যা তাদের ঝুঁকি নিতে এবং উদ্ভাবন করতে উৎসাহিত করবে । সামাজিক স্তরে, আর্থিক সাফল্যকে শুধুমাত্র আয়ের মানদণ্ড দিয়ে বিচার না করে, ঝুঁকি, উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।


পেশা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক চিত্রে চাকরি এবং ব্যবসার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে, নিশ্চিত কর্মসংস্থান ও উচ্চ স্থায়িত্বের কারণে নিরাপত্তা বেশি থাকে । অপরদিকে, ব্যবসা অনিশ্চিত, এতে উচ্চ ঝুঁকি এবং লোকসানের সম্ভাবনা থাকে । সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে, চাকরি উচ্চ সম্মান এবং প্রতিপত্তি নিয়ে আসে , কিন্তু ব্যবসাকে প্রায়শই 'বেকার' হিসেবে গণ্য করা হয় । চাকরির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা সীমিত, কারণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে চলতে হয় , যেখানে ব্যবসার ক্ষেত্রে উচ্চ স্বাধীনতা থাকে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে । আয়ের ধরনেও পার্থক্য দেখা যায়; চাকরিতে নির্দিষ্ট মাসিক আয় থাকে এবং ঝুঁকি কম , কিন্তু ব্যবসায় আয় অনির্দিষ্ট হলেও সফল হলে তা অনেক বেশি হতে পারে । ছুটির বিষয়ে, চাকরিতে নির্দিষ্ট ছুটি ও কর্মঘণ্টা থাকে , কিন্তু ব্যবসায় প্রায় ২৪/৭ কাজ করার মানসিকতা প্রয়োজন হয় । সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে, চাকরিজীবীকে 'সফল' ও 'প্রতিষ্ঠিত' হিসেবে দেখা হয়, যেখানে একজন সফল ব্যবসায়ীও 'স্থিতিশীল নয়' বলে বিবেচিত হতে পারেন । 

বিভিন্ন সময়কালের দিকে তাকালে দেখা যায় যে উপনিবেশিক পূর্ববর্তী সময়ে ভূস্বামী ও জমিদারদের ক্ষমতার মূল উৎস ছিল ভূসম্পত্তি ও বংশমর্যাদা। উপনিবেশিক যুগের প্রথম পর্বে, ব্যবসায়ী বা 'বাবু'রা ব্রিটিশদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতার মাধ্যমে সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জন করতেন । তবে, দ্বিতীয় পর্বে সরকারি আমলা বা 'ভদ্রলোক' শ্রেণির উত্থান ঘটে, এবং ব্রিটিশ-প্রদত্ত সরকারি পদ ও চাকরির মাধ্যমে ক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় । আধুনিক যুগের পূর্ববর্তী সময়ে, স্থিতিশীল মাসিক আয় ও পেনশনের কারণে চাকরি চূড়ান্ত সাফল্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। বর্তমানে, চাকরিজীবী ও উদ্যোক্তা উভয়ই সমাজে প্রভাবশালী, এবং প্রচলিত ধারণার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মূল্যবোধের সংঘাত দেখা যাচ্ছে। 

Shyamal Kumar Rong

আমি মনসুকা খবরের এডিটর। মনসুকা খবরে আপনি যেকোনো খবর, ভিডিও, তথ্য বা গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আপনার তথ্য আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ: ৯৭৭৫৭৩২৫২৫

Previous Post Next Post
Mansuka Khabar

বিজ্ঞাপন

Mansuka Khabar