মনসুকা খবর, শ্যামল রং, ১৯ সেপ্টেম্বর : রাজ্যের কৃষি ব্যবস্থার মূল সংকট এখন আর নতুন বীজ বা সারের অভাব নয়; মূল সংকট হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম অভাব। একদিকে ব্লক অফিসে ফাইলের পাহাড়ে ডুবে থাকা কৃষি প্রযুক্তি আধিকারিক, অন্যদিকে মাঠে অসহায়ভাবে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর দোকানির পরামর্শের উপর ভরসা করে থাকা কৃষক—এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগের সেতুটিই যেন ভেঙে পড়েছে। 'দুয়ারে সরকার' কর্মসূচির বিপুল সাফল্যের আবহে রাজ্যের কৃষকদের পক্ষ থেকে তাই এখন জোরালো দাবি উঠছে: অন্যান্য দপ্তরের মতো কৃষি দপ্তরকেও পৌঁছাতে হবে কৃষকের দোরগোড়ায়। আধিকারিকদের চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াতে হবে কৃষকের পাশে, তাঁর জমির আলে।
সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আধিকারিকদের কর্মক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা। তাঁদের কাজের পরিধি মূলত অফিসকেন্দ্রিক হওয়ায় কৃষকরা সরাসরি তাঁদের সান্নিধ্য পান না। ফলে, যখন নতুন রোগ-পোকার আক্রমণ হয় বা আবহাওয়ার পরিবর্তনে ফসলের ক্ষতি হয়, তখন সঠিক বৈজ্ঞানিক পরামর্শের জন্য কৃষক কার কাছে যাবেন, সেই দিশা খুঁজে পান না। এই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ভুল বা অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ও সার কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে, যার ফলে চাষের খরচ বাড়ছে এবং মাটির স্বাস্থ্য স্থায়ীভাবে নষ্ট হচ্ছে। ক্রমাগত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে কীটপতঙ্গের জৈববিবর্তন ঘটছে, বাড়ছে মানুষের শরীরে ক্যানসার, হরমোনের সমস্যা সহ নানান জটিল রোগের ঝুঁকি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো একটি বাধ্যতামূলক এবং নিবিড় জনসংযোগ কর্মসূচি। সরকারের কাছে প্রস্তাব, অবিলম্বে "কৃষকের দোরে কৃষি আধিকারিক" নামক একটি নতুন মডেল চালু করা হোক, যা গতানুগতিক ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেবে। এই মডেলে, কৃষি আধিকারিকের প্রধান কাজ হবে দপ্তরে বসে থাকা নয়, বরং গ্রামের মাঠে-ঘাটে কৃষকদের সঙ্গে সময় কাটানো।
এর জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রত্যেক কৃষি প্রযুক্তি আধিকারিকের জন্য একটি বাধ্যতামূলক সাপ্তাহিক রুটিন তৈরি করতে হবে, যেখানে সপ্তাহের অন্তত তিন দিন তাঁকে নির্দিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই বৈঠকগুলি গতানুগতিক সভার মতো হবে না; হবে কর্মশালার মতো। আধিকারিকরা কৃষকদের জমিতে গিয়ে হাতে-কলমে দেখাবেন কীভাবে জৈব সার তৈরি করতে হয়, কীভাবে বন্ধু পোকা এবং শত্রু পোকা চিনতে হয়, বা কীভাবে সঠিক মাত্রায় জলসেচ করতে হয়। তৃতীয়ত, প্রতিটি গ্রামে মাসে অন্তত একটি সান্ধ্যকালীন 'কৃষি চৌপাল' বা কৃষক আড্ডার আয়োজন করতে হবে, যেখানে কৃষকরা তাঁদের সারাদিনের কাজ শেষে খোলা মনে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন।
এই ব্যবস্থা চালু হলে কৃষি আধিকারিকের ভূমিকা একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার থেকে রূপান্তরিত হয়ে "কৃষি-বন্ধু" বা "কৃষি-সহায়ক"-এ পরিণত হবে। যখন কৃষক দেখবেন, সরকারি আধিকারিক তাঁর জমিতে এসে তাঁর সমস্যার কথা শুনছেন এবং সমাধানের পথ বাতলে দিচ্ছেন, তখন তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। তিনি তখন আর দোকানির কথায় নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত হবেন। সরকারের সদিচ্ছা যদি থাকে, তবে এই একটি পদক্ষেপই পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে এবং রাজ্যের লক্ষ লক্ষ কৃষককে এক সুস্থির ও লাভজনক ভবিষ্যতের দিশা দেখাতে পারে।



