শ্যামল রং, ঘাটাল: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকায় লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ এবং মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি বর্তমানে বাংলার রাজনীতির অন্যতম চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে মহিলা ভোটারদের নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে জোর দিয়ে এসেছে। ২০২৪-এর লোকসভা থেকে ২০২৬-এর আসন্ন নির্বাচন— ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী তালিকার বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক নকশা ফুটে ওঠে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ১২টিতে মহিলা প্রার্থী দিয়েছিল, যা ছিল মোট প্রার্থীর প্রায় ২৮ শতাংশ। আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ২৯১টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছেন, সেখানে ৫৩ জন মহিলা প্রার্থীকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। শতাংশের বিচারে এটি প্রায় ১৮.২ শতাংশ। যদিও তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সংখ্যাটিকে আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছিল, তবুও অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় এই সংখ্যাটি উল্লেখ্যযোগ্য।
তৃণমূলের অন্দরের বিশ্লেষণে এই ‘মহিলা কার্ড’-এর নেপথ্যে উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রভাব। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ২ কোটিরও বেশি মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী। এই বিশাল ভোটব্যাঙ্ককে সংহত রাখতে নারী প্রার্থীর উপস্থিতি দলের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। পঞ্চায়েত স্তর থেকে বিধানসভা— অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষ নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের মোকাবিলায় ‘ক্লিন ইমেজ’-এর লড়াকু মহিলা প্রার্থীদের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে।
তবে ঘাটাল কেন্দ্রের ক্ষেত্রে লড়াইটা আরও কঠিন। ২০২১-এর নির্বাচনে এই আসনে বিজেপি প্রার্থী শীতল কপাটের কাছে পরাস্ত হতে হয়েছিল তৃণমূলকে। হারানো সেই জমি ফিরে পেতে এবার আর কোনও ঝুঁকি নিতে চায়নি কালিঘাট। শীতল কপাটের জয়ের পর থেকেই এলাকায় গেরুয়া শিবিরের যে আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, তাকে চুরমার করতেই শঙ্কর দোলইয়ের মতো হেভিওয়েটকে সরিয়ে শ্যামলী সর্দারের ওপর ভরসা রাখা হয়েছে। বিজেপি-র জয়ী বিধায়কের মোকাবিলায় দলের তুরুপের তাস এখন এই লড়াকু নেত্রীই। বুথ স্তরে মহিলা কর্মীদের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা এবং যোগ্য নেত্রীদের সুযোগ করে দেওয়া এখন দলের জন্য আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে মহিলা প্রার্থীর এই সংখ্যা তাত্ত্বিকভাবে যতটা উজ্জ্বল, বাস্তব রাজনৈতিক ময়দানে তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখেও দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে নারী নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নে সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্দোলন ও সামাজিক আবহে তৃণমূলকে এবার আরও বেশি করে নারী নেত্রীদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই লিঙ্গ অনুপাত আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল— একদিকে যেমন নারী ক্ষমতায়নের বার্তা দেওয়া, অন্যদিকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে মহিলাদের আবেগকে সরাসরি দলের প্রতীকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। শীতল কপাটের জেতা আসনে শ্যামলী সর্দার ঘাসফুল ফোটাতে পারেন কি না, ৪ঠা মে-র ফলাফলই বলে দেবে সেই লিঙ্গ ভারসাম্যের রসায়ন কতটা কার্যকর হলো।
